Advertisement

উন্মেষ

গল্প ছাড়া মানুষের জীবন ভাবাই যায় না : মনি হায়দার

moni haider weeklyunmesh.com

মনি হায়দার-এর জন্ম ১ মে ১৯৬৮ সনে- ভাণ্ডারিয়া, পিরোজপুরে। তুখোড় এ কথাকার গল্প লিখছেন প্রায় তিন দশক যাবত। প্রকাশিত হয়েছে তার বেশ কয়েকটি গল্পের বই। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে : মুক্তিযুদ্ধের গল্প (আগামী, ১৯৯৬), প্রকৃত নায়ক (ম্যাগনাম ওপাস, ২০০০), এক ঝাঁক মানুষের মুখ, (জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশ, ২০০২), ইতিহাসের বেলিফুল (গ্লোব লাইব্রেরী, ২০০৩) থৈ থৈ নোনাজল (ঐতিহ্য, ২০০৬), আঠারো বছর পর একদিন (মনন প্রকাশ, ২০০৮), একটি খুনের প্রস্তুতি বৈঠকের পর (স্বরাজ প্রকাশনী, ২০০৮), একজন নারী তিনজন পুরুষ ও একটি চুলের গল্প (বৈশাখী প্রকাশ, ২০১০), ন্যাড়া একটি বৃক্ষ (নান্দনিক, ২০১২), ঘাসকন্যা (কথাপ্রকাশ, ২০১৪)। মনি হায়দার বসবাস করেন গল্পের আখ্যান ও গল্পের চরিত্রের সঙ্গে। জীবনকে অজস্র কৌণিকবিন্দু থেকে দেখার ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা তাঁর সার্বভৌম। লেখালেখির স্বীকৃতিস্বরূপ অর্জন করেছেন এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০০৮), অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০০৯)।

গল্পচর্চা, গল্পপাঠ, সমকালীন বাংলা গল্পের গতিপ্রকৃতির বিষয়কে উপজীব্য করে বরেণ্য এ গল্পকারের সঙ্গে কথা বলেছে উন্মেষ সাহিত্য সাময়িকী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শফিক হাসান—

আপনার গল্প লেখার শুরু কখন, কীভাবে?
মনি হায়দার : গল্প! আমার তো মনে হয়, আমি জন্ম নিয়েই গল্প লিখতে শুরু করেছি। আমি বলতে চাইছি, মানুষের জন্মটাই গল্পের ভেতর দিয়ে। নারী-পুরুষের ভালোবাসা বা প্রেম বা শরীরের সংগ্রাম সবই তো গল্পের বাসভূমি থেকে উৎসারিত। ঐসব ঘটনা অনানুষ্ঠানিক। যদি অনানুষ্ঠানিকভাবে বলি, আমি গল্প লিখতে শুরু করি প্রায় শৈশব থেকে। যতদূর মনে পড়ে এইটে বা নাইনে পড়ার সময় আমি প্রথমে গল্প লিখি। অবশ্যই ছোটদের গল্প। কীভাবে গল্পের জগতে প্রবেশ করেছিলাম- তাও গল্পের আখ্যান। আমাদের বাড়িতে, সেই অজপাড়াগাঁয়ে, বলছি আমি আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগের ঘটনা, আমার বাবা তবিবুর রহমান, মা ফজিলাতুন নেসা পুষ্প বই পড়তেন। শরৎচন্দ্রের অনেক বই আমাদের বাড়িতে ছিলো। ‘পণ্ডিতমশাই’ উপন্যাসটি আমি সেই সময়েই পড়েছিলাম। আমার বড় ভাই রুহুল আমিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। তারও পড়ার অভ্যাস ছিলো। গানও লিখতেন। তো তিনি বাড়িতে এক ট্রাঙ্ক বই এনেছিলেন- গল্প, উপন্যাস। আমি দোতলার খাটের নিচে সেই বই আবিষ্কার করে পড়তে থাকি। সেই সময়েই আমি বড়দের অনেক বই পাঠ করেছি। সেইসব বই পাঠ করতে করতে আমার ভেতরে জেগে ওঠলো এক সৃজন সত্তা, সেই সত্তা আমাকে বললো, তুমিই লিখতে পারো। আমি একদিন রুল টানা লম্বা খাতা নিয়ে লিখতে বসে গেলাম। যতদূর মনে পড়ে- একটা প্রলেতারিয়েত মার্কা গল্প লিখেছিলাম। তো সেই শুরু- বরিশালের পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়া উপজেলার পশ্চিমপ্রান্তে কচানদীর পাড়ে বোথলা গ্রামের এক নির্জন বাড়িতে আমার লেখার অঙ্কুর উদগম হয়েছিলো... হয়তো সকালে, নয়তো বিকেলে, অথবা রোদজ্বলা দুপুরের কোনো এক সময়ে।

গল্প লেখেন কেন?
মনি হায়দার : আগেও বেশ কয়েকটি সাক্ষাৎকারে আমাকে এই প্রশ্ন করা হয়েছিলো, আমি উত্তর দিয়েছিলাম, গল্প না লিখে উপায় নেই আমার, তাই গল্প লিখি। একজন সৃজনশীল মানুষ হিসেবে চারদিকে বিরামহীন গল্পের আসা-যাওয়া দেখি। গল্পেরা আমার সঙ্গে দিনরাত গল্প করে। চারপাশে এত এত গল্প দেখি, গল্পের জলে বাস করি, গল্পের নাচ দেখি, মথন ঝগড়া দেখি, গল্পের মান অভিমান দেখি, ফলে আমার ভেতরে এক ধরনের সৃজন গীত তৈরি হয়। একটা নাড়া খাওয়া এক ধরনের যন্ত্রণার মধ্যে নিপতিত হই, সেইসব যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া জন্য গল্প আমাকে বাধ্য হয়ে লিখতে হয়। গল্প না লিখলে আমি ঘুমুতে পারি না। গল্প না লিখলে গল্পেরা অভিমান করে আদুরে প্রেমিকার মতো। অনেক সময়ে আমাকে গলা টিপে হত্য করতে আসে। এতকিছুর পরও যদি গল্প না লিখি গল্পেরা সাপের ফণা তুলে আমার দিকে ধেয়ে আসে, আমি বাধ্য হই লিখতে। গল্প লেখার পরই পাই মুক্তি। আহ কী আরাম! কী আনন্দ! কী সুখ। এইসব সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোর সঙ্গে বাস করার জন্য আমি গল্প লিখি। গল্পের সঙ্গে আমার ঘর গৃহস্থালি।
গল্পের সঙ্গে থাকতে থাকতে আমার মনে হয়, মানুষের জীবন- গল্পেরই জীবন। গল্প ছাড়া মানুষের জীবন ভাবাই যায় না। প্রতিটি মানুষের জীবনে শত শত নয়, হাজার হাজার গল্প আছে। একজন মানুষ এক জীবনে তার গল্প লিখে শেষ করতে পারবে না। আমি, আমার এই সামান্য জীবনে যত গল্পের মালিক, সব গল্প তো পাঠকদের জন্য লিখে যেতে পারবো না। সময় এবং সুযোগ আমাকে আটকে রেখেছে। আমার মতো অন্য গল্পকারদেরও আটকে রাখছে। বন্দিদশা থেকে মুক্তির জন্য গল্প লেখা জরুরি, খুব জরুরি।

কী ধরনের বিষয় নিয়ে গল্প লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?
মনি হায়দার : শফিক হাসান, আপনাকে পাল্টা প্রশ্ন করি, গল্পের কি নির্দিষ্ট ধরন থাকে? ধরুন, একটা ধরন আমাকে ধরিয়ে দিলেন, বললেন, আপনি কেঁচো নিয়ে গল্প লিখুন। বলেই কিন্তু আপনি একজন সৃজনশীল গল্পকারকে আটকে দিলেন সীমাবদ্ধ সীমায়। যখন একজন গল্পকার সীমার দেয়ালে আটকে যাবেন তিনি কি লিখতে পারবেন? আমি নিশ্চিত, লিখতে পারবেন না।
সতরাং ধরন-ধারণ বাদ দিন। বিষয়, গল্প লেখার বিষয়ের কি অভাব আছে অন্তত দারিদ্র্যপীড়িত, ক্ষমতালিস্পায় তাড়িত একদল পঙ্গপাল মানুষের লম্ফঝম্ফ দেখে, স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে যখন দেখি রক্ত, কাটা মু-ু, হাসে বীভৎস, দেশের হাজার হাজার তরুণ বৃদ্ধ নরনারী শিশু যখন ভিন দেশের সাগরের বুকে তড়পায়, আমার বোন ফেলানী যখন সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ায় ঝোলে রক্তাক্ত- তখন কি একজন প্রকৃত গল্পকারের গল্পের বিষয়ের অভাব হয়?
ব্যক্তিগতভাবে আমি মানুষের মনের আয়নাটা ধরতে চাই। একজন মানুষ সুটেট বুটেট, যাচ্ছে হেঁটে চমৎকার। যে কেউ দেখলে ভাববে, মানুষটি দারুণ সুখী। আসলে কি সুখী? কিংবা বয়ে বেড়ায় টনটন সুখ? আমি একজন লেখক বা গল্পকার হিসেবে ঐ মানুষটিকে আমার গল্পের কলকব্জায় নিয়ে আসি, তাকে ব্যবচ্ছেদ করি,  দেখতে ও দেখাতে চাই- আমরা সোজা চোখে যা দেখি, সেই দেখা ঠিক না। দেখার মধ্যেও প্রচুর অদেখা থেকে যায়। দেখা ও অদেখা, জানা ও অজানা, মন ও জানালা, পাথর ও ফুল, কাঁটা ও রক্ত আমার গল্পের বিষয়।

পাঠকদের ওপর আপনার গল্পের প্রভাব কেমন?
মনি হায়দার : পাঠকরা পড়ে, দেখা হলে জানান দেয়, কিংবা ফোনে বলেন গল্প পাঠ শেষে তাদের প্রতিক্রিয়া। সব সময়ে পজিটিভ হয়, তাও না। তবে যখন কোনো কোনো পাঠক প্রশ্ন করেন, ওই গল্পটা ওভাবেও শেষ না করলে পারতেন। আরে বাবা, গল্প লিখি আমি, গল্পের আখ্যান ভাবি আমি, আমিই আমার গল্পকে কোথায় নিয়ে যাবো নাকি রসগোল্লা খাইয়ে বাসে তুলে দেবো সেটা আমার ব্যাপার। তুমি, দেখো গল্পটা শিল্পসম্মত হয়েছে কি না? দেখো, এই তোমার জীবনের বারান্দায় দোল খায় কি না!
তো এইসব ঘটনার মাঝে পাঠকদের উপর একটা প্রভাব তো পড়েই। নইলে লেখার জন্য প্রেরণা আসবে কোত্থেকে? সব কিছুর উপরে পাঠক সত্য তাহার উপরে নাই।

গল্প লেখার সার্থকতা খুঁজে পান?
মনি হায়দার : গল্প লেখার সার্থকতা বলতে কী বোঝায়, আমাকে পরিষ্কার করে বলবেন? আপনি একটি নির্দিষ্ট জায়গায় যাবেন, যাওয়ার জন্য আপনাকে তো যাত্রা করতে হবে। যাত্রা না করেই যদি বলেন, আমি পৌঁছুতেই পারলাম না। নিট ফলাফল কী দাঁড়ায়? আপনি কখনই যেতে পারবেন না। একজন গল্পকার বা কথাসাহিত্যিকের কাছে লেখার সার্থকতা বহুমাত্রিক চৈতন্যের বসতবাড়ি।
গল্পকার যদি গল্প লেখার সার্থকতা নিজের মধ্যে না পান বা আবিষ্কার করতে না পারেন, তিনি লিখবেন কী করে? আর কেনই বা লিখবেন? মূলত একজন গল্পকারের গল্প লেখার ভেতরই সার্থকতা বহুলাংশে নির্ভর করে।

আপনার কতটা গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে?
মনি হায়দার : আমার বারোটা গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। বইগুলোর নাম- এক ঝাঁক মানুষের মুখ, প্রকৃত নায়ক, ন্যাড়া একটি বৃক্ষ, একজন নারী তিনজন পুরুষ ও একটি চুলের গল্প, মুক্তিযুদ্ধের গল্প, থৈ থৈ নোনাজল, আঠারো বছর পর একদিন, একটি খুনের প্রস্তুতি বৈঠকের পর, ইতিহাসের বেলিফুল, ঘাসকন্যা, ১০ জানুয়ারী ১৯৭২ ও অন্যান্য গল্প।

বইগুলোর মধ্যে কোন বইটা আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য বা প্রিয়?
মনি হায়দার : প্রতিটি গল্পের বই আমার কাছে গ্রহণযোগ্য এবং অনিবার্যভাবে প্রিয়। আবার প্রিয়র মধ্যেও আরও প্রিয় কোনটি, এই প্রশ্নে আমি বলতে চাই, গতবছর বইমেলায় কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ , ‘ঘাসকন্যা’ সাত আট বছর আগে ঐতিহ্য থেকে প্রকাশিত ‘থৈ থৈ নোনাজল’ এবং এ বছর বইমেলায় নওরোজ কিতাবিস্তান থেকে প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘১০ জানুয়ারী ও ১৯৭২ ও অন্যান্য গল্প’ আমার প্রিয় থেকে প্রিয়তর গল্পগ্রন্থ। এ বইগুলোর অধিকাংশ গল্প, গল্পের আখ্যান খুব সংহত। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে পারি, আমি এই বইয়ের গল্পগুলো খুব চিন্তা ও পরিকল্পনা করে লিখেছি। ফলে যে কোনো পাঠক এই গল্পগুলো থেকে আমাকে খুব নিবিড়ভাবে আবিষ্কার করতে পারবে।

Post a Comment

0 Comments