Advertisement

উন্মেষ

গল্প ছাড়া মানুষের জীবন ভাবাই যায় না : মনি হায়দার

Shafique_hasan sakkhatkar jpg

দ্বিতীয় পর্ব

সব গল্প কি আপনার প্রিয়?
মনি হায়দার : একজন গল্পকারের সব গল্প প্রিয় হয় না, নানা কারণেই হয় না। এক সময়ে যে গল্পটি গল্পকারের খুব প্রিয় হয়, সময় বা রুচির কারণে সেই গল্পটি পছন্দের তালিকায় নাও থাকতে পারে। মানুষের মন যেমন বিচিত্র পছন্দ, অপছন্দের তালিকা আরও বিচিত্র। আর লেখককের মন তো আরও অস্থির, স্থির থাকে না কোথাও ক্ষণকাল- সময়ের সঙ্গে, স্রোতের সঙ্গে বা বিপরীতে কেবল বহিয়া যায় অবিরাম।

এইসব দ্বৈত অদ্বৈত চেতনার কারণে- না, আমার লেখা সব গল্প আমার কাছে প্রিয় নয়। আবার আমার কাছে যেসব গল্প প্রিয়, দেখেছি অনেক পাঠকের কাছে সেটা প্রিয় নয়, আমার কাছে দুর্বল গল্পটাই তার কাছে অধিকতর প্রিয়। পাঠকদের নিজস্ব মতামত, রুচি, সৌন্দর্যবোধ, গল্প মন্থন করার আবেগ, ইন্দ্রিয়ঘ্রাণ, লেখাপড়ার দৌড়, জানবার ইচ্ছের উপর অনেক কিছু নির্ভর করে।

আমার কাছে আমার লেখা বেশ কয়েকটা গল্প প্রিয়। যেমন- ঘাসকন্যা, রক্ত মাংসের মানুষ, মন সংক্রান্তি, রক্ত ও রূপান্তরের গল্প, তিমিরেরও তিমির, স্পর্শ, পাখি, টস, কুলসুম ও একজন পাহারাদার, খেলা শেষে আইনুদ্দিন, এইতো নদীর খেলা, ইদুর মডেল, অপরাধবোধ, ভেতরের মানুষ, বারান্দায় দেখা আলো ও অন্ধকার, একজন নারী তিনজন পুরুষ ও একটি চুলের গল্প, ধিকিধিকি, পাশবিক পাশা খেলায়, আত্মঅবলোকন, পারুল বোনটি আমার, ১০ জানুযারী ১৯৭২, খেলা, খোয়াজ খিজির, একটি ভোরের গল্পসহ আরও কিছু গল্প, আমার কাছে প্রিয়। আবার দশ বছর পর এই তালিকা পরিবর্তনও হতে পারে।

এই গল্পগুলোর বাইরে আরও গল্প আছে, যে গল্পগুলোয় আমি বাংলার জল, জমিন, মানুষ- বিচিত্র মানুষের কাম ক্রোধ লোভ লালসা প্রেম অপ্রেম উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি।

এখন পর্যন্ত আপনার কতটি গল্প প্রকাশিত হয়েছে?

মনি হায়দার : হিসাব করিনি। তারপরও আমার অনুমান দুশোটির মতো গল্প আমি লিখেছি।

ছোটদের জন্য লেখা গল্প মিলিয়ে?
মনি হায়দার :
ছোটদের জন্য লেখা গল্প এই হিসেবে আনিনি। কারণ, প্রশ্ন তো করছেন বড়দের গল্প সম্পর্কে। এই ফাঁকে একটা বিষয় জানিয়ে রাখি, 

শিশুসাহিত্য দিয়েই আমার লেখালেখির যাত্রা শুরু। আমার প্রথম গল্প ছাপা হয় ১৯৮৬ সালে সেই সময়ের দৈনিক বাংলার বাণীর ছোটদের পাতা ‘শাপলা কুঁড়ির আসর’ এর পাতায়। শুরুর পর থেকে ক্রমাগত তিন চা বা পাঁচ বছর কেবল ছোটদের জন্য লিখেছি, লিখে লিখে আমার আমাকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছি। কয়েক বছর পর যখন বুঝতে পারলাম, আমার পায়ের নিচের মাটি একটু শক্ত হয়েছে, বড়দের জন্য লিখতে শুরু করেছি। কিন্তু আমি ছোটদের জন্য এখনও ছাড়িনি। এবং কখনও ছাড়বো না। 

ছোটদের জন্য লেখা কঠিন, কারণ, ছোটদের জন্য লিখতে গেলে সময় এবং পরিস্থিতিকে একজন লেখককে গভীর ধ্যানের সঙ্গে ধারণ করে লিখতে হয়, বাক্য, শব্দ এবং আখ্যানকে মাথায় রাখতে হয়। ওই জগতের পুরোটাই আমার মননে গভীরভাবে প্রোথিত। ছোটদের জন্য লিখতে গেলে আমি আমার ফেলে আসা দিনরাত্রির কাছে ফিরে যাওয়ার একটা অনাবিল সুযোগ পাই। সেই সুন্দর সুযোগটা হারাতে চাই না। তাছাড়া, একজন সৃজনশীল লেখক হিসেবে এই দেশের এবং তাবৎ পৃথিবীর শিশুদের প্রতি আমার দায় রয়েছে, সেই দায় আমি লেখার মধ্যে দিয়ে পালন করতে চাই।

খুবই পজিটিভ একটা দিক আপনার। আমাদের দেশে অধিকাংশ লেখক ছোটদের জন্য লিখতে চান না। অথচ আমরা জানি বিশ্বসাহিত্যের খ্যাতিমান লেখকেরা ছোটদের জন্য লিখেছেন
মনি হায়দার : অনিবার্য সত্য বলছেন আপনি। ছোটদের মধ্যে দিয়েই তো আমি আপনি আমরা বেঁচে থাকবো। অনাদিকালের দুনিয়ায় আমরা কী দেখছি? একশতকের মানুষ চলে যায়, তাদের পায়ের উপর পা রেখে আর একদল মানুষ বা মানুষের উত্তরাধিকারী চলে আসে। মহামানবের ধারাবাহিতকতায় আমরা তাদের জন্য রেখে যেতে চাই কুসুমপথ। সেখানেই সৃজনশীল ও মননশীল মানুষ হিসেবে আমাদের দায়, ছোটদের জন্য লেখা। যেমন লিখেছেন পূর্বপুরুষেরা। তারা লিখেছেন আমাদের জন্য। আমরা লিখে রেখে যাবো আমাদের পরের প্রজন্মের জন্য। অনেকে কিন্তু ছোটদের জন্য লিখেছেন- শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, সেলিনা হোসেন, শওকত আলী, রাবেয়া খাতুন, আনোয়ারা সৈয়দ হক, হাসান আজিজুল হক এরা বড়দের পাশাপাশি ছোটদের জন্যও প্রচুর লিখেছেন। এদের হাতে আমাদের শিশুসাহিত্য বিশেষ মাত্রা পেয়েছে।
 
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আপনি অনেক গল্প লিখেছেন। ছোটদের জন্য যেমন বড়দের জন্যও- একজন মানুষকে নিয়ে এতা গল্প লিখতে পুনরাবৃত্তি আসে না?
মনি হায়দার : আমি ছোটদের জন্য বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এ পর্যন্ত গল্প লিখেছি বিশটিরও অধিক। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে ‘জনকের গল্প’ নামে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে বছর দুয়েক আগে। বইটিতে আটটি গল্প আছে, আপনি পাঠ করে দেখতে পারেন, পুনারাবৃত্তি এসেছে কি না! আমি আপনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি- একটি গল্পের সঙ্গে অন্য গল্পের কোনো মিল পাবেন না। প্রতিটি গল্প আলাদা, অন্যরকম সত্তা নিয়ে গড়ে ওঠেছে। আর পুনরাবৃত্তি না হওয়ার কারণ, আমার এই গল্পের নায়ক কে? নায়ক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি সেই শৈশব থেকে গাঙ্গেয় বদ্বীপের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য লড়াই করেছেন, একজন মানুষ থেকে রূপান্তরিত হয়েছের হাজার, লক্ষ এবং কোটি মানুষে। একক সত্তা থেকে তিনি হয়েছেন বহুমাত্রিক। বিচিত্র তার জীবন, বিশ্ব রাজনীতিতে সাহসী মানুষের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ তিনি। বিশাল তাঁর কাজের পরিধি। তো, তাকে নিয়ে একটা নয়, একশো গল্প লিখলেও পুনরাবৃত্তি আসবে না, অন্তত আমার পক্ষে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যেমন ছোটদের জন্য লিখেছি গল্প, তেমন লিখেছি বড়দের জন্যও। বড়দের জন্য বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখেছি পাঁচটা গল্প। আপনি পাঠ করে দেখতে পারেন, প্রতিটি গল্প আলাদা, বিষয়বস্তু এমনকি প্রকরণেও। গত বছর পনেরোই আগস্ট দৈনিক ইত্তেফাকের পাতায় আমার একটা গল্প ছাপা হয়েছে- ‘শেখ মুজিবের রক্ত’ নামে। আমার গল্প বলে বলছি না, অন্যরকম গল্প। এই গল্পটি নিয়ে চলচ্চিত্রকার মাসুদ পথিক চলচ্চিত্র বানাতে চেয়েছেন। জানি না, ব্যাটে বলে কখনও সম্ভব হবে কি না- কিন্তু আগ্রহ প্রকাশও তো একটা স্বীকৃতি।

মুক্তিযুদ্ধ আপনার গল্পের বড় একটা উপাদার

মনি হায়দার : অনিবার্যভাবে। কারণ, আজ যে আপনি আমার সঙ্গে আমার গল্প, গল্পের কলকব্জা নিয়ে কথা বলছেন। যদি এই দেশটা স্বাধীন না হতো, আমি কি গল্প উপন্যাস লিখতাম? আপনি কোথায় থাকতেন- আপনিও জানেন না। আমি বাংলা একাডেমিতে চাকরি করি, বাঙালিরা এই প্রতিষ্ঠানের ডিজি, পাকিস্তান থাকলে এই প্রতিষ্ঠানের ডিজি হতো একজন পাকিস্তানি। আামদের শিখতে হতো উর্দু ভাষা। আর সব সময়ে পা চাটতে হতো ওই প্রভুদের ভয়ার্ত কুকুরের মতো। এইভাবে আপনি প্রতিটি প্রতিষ্ঠান চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন, পরিস্থিতি কত ভয়াবহ হতো। দেখুন না চব্বিশ বছরে, পাকিস্তানিরা আমাদের দেশের একজন ক্রিকেটারকে ক্রিকেট খেলতে দেয়নি। সাড়ে সাত কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র তিনজন বাঙালি সচিব ছিলেন। আর্মির অবস্থা ছিলো আরো শোচনীয়। মেজরের উপরে কোনো বাঙালির পদ ছিলো না। কারণ, ওরা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতো, বাঙালিরা ভীতু। আরও ভয় পেতো- বাঙালিদের বড় জায়গা পেলে দক্ষতা প্রকাশ করলে একদিন অধিকার চেয়ে বসবে।

বাংলাদেশ আজ স্বাধীন। আমার দেশে আমি আপনি স্বাধীন সত্তায় বুক ফুলিয়ে হাঁটি। কথা বলি। গল্প লিখি। নিজেকে শিল্পের আকাশে ছড়িয়ে দিচ্ছি- এই যে অর্জন এর সবটুকু একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ, স্বাধীনতা অর্জন। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তো লিখতেই হবে, মাটির কাছে, নদীর কাছে, পাখির কাছে, ফসলের কাছে, আমার কাছে আমার এ অঙ্গীকার। ফলে, যখনই অনুরুদ্ধ হয়েছি কিংবা মনের কোণে কোনো আখ্যান এসেছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখেছি- গল্প। সেইসব গল্প নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের গল্প নামে একটি গ্রন্থ, শোভা প্রকাশ থেকে।

বইটিতে কতোটি গল্প আছে?

মনি হায়দার : আমার এ মুহূর্তে যতদূর মনে পড়ছে, বাইশটি গল্প আছে বইটিতে।

Post a Comment

0 Comments