সুমন মজুমদার, পৈত্রিকভাবে গ্রামের বাড়ি ভোলা হলেও জন্ম ও কর্মভূমি ঢাকা। একটা জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় জৈষ্ঠ্য সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। লেখালেখি, মঞ্চনাটক, আড্ডা এভাবেই চলছে জীবন। দুই মেয়ে সুকন্যা তুর্না ও সুকৃতি প্রিয়ামসহ সংসারটা সামাল দিচ্ছে স্ত্রী হেনা মজুমদার। প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা দুই। রাইমঙ্গল (উপন্যাস) ও চাতক প্রায় অহর্নিশি (গল্পগ্রন্থ)।
সম্প্রতি তিনি রাইমঙ্গল উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমি রাবেয়া খাতুন কথাসাহিত্য পুরস্কার ২০২৪। পুরস্কার প্রাপ্তি, লেখালেখি নিয়ে কথা বলেছেন 'উন্মেষ' সাহিত্য সাময়িকীর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদক সাজেদুর আবেদীন শান্ত—
বাংলা একাডেমি 'রাবেয়া খাতুন কথাসাহিত্য পুরস্কার ২০২৪' পেলেন, অভিনন্দন আপনাকে
সুমন মজুমদার : ধন্যবাদ।
পুরস্কার পাওয়ার পর অনুভূতি জানতে চাই?
সুমন মজুমদার : যে কোন স্বীকৃতিই তো আনন্দদায়ক। রাইমঙ্গল আমার প্রথম উপন্যাস এবং প্রথম ছাপা হওয়া বই। সুতরাং অন্যরকম একটা আনন্দ তো কাজ করছেই। আর পুরস্কারটা যেহেতু বাংলা একাডেমি প্রবর্তিত রাবেয়া খাতুনের মতো সাহিত্যিকের নামানুসারে, তাই তৃপ্তিটা একটু বেশিই।
পুরস্কার প্রাপ্তি কি দায়বদ্ধতা বাড়িয়ে দিলো?
সুমন মজুমদার : স্বীকৃতি আসুক বা না আসুক, পাঠকের কাছে সাহিত্যিকের দায়বদ্ধতা সব সময়ই থাকে। অন্তত আমি অনুভব করি। তবে এটা ঠিক, বড় স্বীকৃতি আরো ভালো কিছু করার তাগিদ দেয়। একইসঙ্গে কিন্তু সাবধানও করে তোলে পাঠ, কল্পনা, লেখা, চিন্তাচর্চার ধারাবাহিকতার মান উন্নত করা নিয়ে।
লেখালেখি শুরুর গল্প জানতে চাই—
সুমন মজুমদার : শুরুটা ক্লাস সিক্সে থাকতে স্কুল ম্যাগাজিনে। প্রচুর চঞ্চল আর দুষ্ট ছিলাম। মারধরের শেষে একদিন মা বললেন, এসব না করে একটা গল্প কবিতা তো কল্পনা করে লিখতে পারিস।
ব্যাস, মারের ব্যাথা নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সেই যে শুরু করলাম কল্পনা, তা এখনো চলছে। তারপর মাঝে মাঝেই লিখতাম, তবে লুকিয়ে রাখতাম। পাগলের মতো বিভিন্ন ধরনের বই পড়ার অভ্যাস আর কলেজে উঠে নানা সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে আমার কল্পনা আর চিন্তা পরিশীলিত হতে থাকে। তখনই মূলত বিভিন্ন লিটল ম্যাগে কবিতা পাঠাতে শুরু করি।
তারও অনেক পরে সাহস করে পত্রিকায়। কবিতা চেষ্টা করতে করতে কবে যে গল্প উপন্যাস লেখা শুরু করলাম ঠাহর করে উঠতে পারিনি। এখন আর আলাদা করে কবিতা কেন যেন লিখতে পারি না, সে জন্য একটা তীব্র দুঃখবোধ, হতাশা কাজ করে। তবে আমার গল্প উপন্যাসও মূলত কবিতাই বলে।
কী ধরনের বিষয়বস্তু নিয়ে লিখতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন?
সুমন মজুমদার : কঠিন প্রশ্ন। কখন যে কি লিখতে স্বাচ্ছন্দবোধ করি বলা মুশকিল। এখানে স্বাচ্ছন্দবোধের কিছু নেই, কথা নিজের মতো করে নিজের ভাষায়, স্টাইলে প্রকাশ করতে পারছি কিনা সেটাই প্রধান। তবে নিজের লেখালেখির ধরন বা স্টাইল যদি বিচার করতে বলা হয়, তাহলে বলবো আমার বেশিরভাগ লেখা, মানে গল্প উপন্যাস আখ্যানকেন্দ্রীক নয় বরং খানিকটা অনুভূতিপ্রধান।
আপনি একজন গল্পকার, পাঠকের ওপর গল্পের প্রভাব কেমন?
সুমন মজুমদার : কি পড়ে কার কেমন অনুভূতি হয় আমি জানি না। তবে অনেক গল্প উপন্যাস কবিতা এমনকি কলামও পাঠক হিসেবে আমার উপর তুমুল প্রভাব ফেলে। পত্রিকাস্টল থেকে কেনা একটা চটি ভূত-প্রেত, দৈত্য-দানো বা নিছক বইয়ের পাঠও আমাকে কল্পনার ডালপালা মেলতে সাহায্য করে। অন্যদের ক্ষেত্রেও হয়তো এমন হয়।
গল্প লেখার সার্থকতা খুঁজে পান?
সুমন মজুমদার : এই তৃপ্তি যেদিন চলে আসবে, সেদিন লেখা আর ভাবনাগুলো একঘেয়ে একইরকম হয়ে যাবে হয়তো।
বাংলা সাহিত্যে গল্পের যে নতুন ধারা তৈরি হয়েছে সে প্রেক্ষাপটে আপনার লিখনপ্রস্তুতি কী রকম?
সুমন মজুমদার : লেখন প্রস্তুতি খুবই অগোছাল। কখন কী দেখে, কী ভেবে লিখতে বসি সেটা বলা মুশকিল। দেখা গেল একটা গল্প মাথায় নিয়ে দিনের পর দিন ঘুরছি, কিন্তু লেখা হচ্ছে না। আবার যা কখনো ভাবিনি, সেটাই একরাতে লিখে ফেলছি। একটা ভালো বই, সিনেমা, নাটক, পেইন্টিং আমাকে অবচেতনভাবে লিখনপ্রস্তুতি নিতে সাহায্য করে। এখন সব ভালো তো আর সবসময় পাওয়া যায় না।
গল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনি কতটুকু আশাবাদী?
সুমন মজুমদার : আসলে জানি না। মানুষের জীবনের প্রতিটি বাঁকই তো আসলে এক একটা গল্প। শুধু মানুষ কেন, প্রকৃতি জগতের প্রতিটি বিষয় চাইলে আলাদা গল্প বলতে পারে। সুতরাং গল্পের হয়তো কোন ভবিষ্যৎ হয় না, গল্প একেবারেই বর্তমান। শুধু সময়ের সঙ্গে তার বিষয়বস্তু ও চরিত্ররা পাল্টায়।
আপনার গল্প লেখার প্রেরণা কী?
সুমন মজুমদার : প্রেরণা কিছু না। আমার পড়তে, দেখতে, ভাবতে, লিখতে ভালো লাগে।
আপনার প্রিয় গল্পকার কারা? কেন প্রিয়!
সুমন মজুমদার : প্রশ্নটা কি প্রিয় গল্পকার কে নাকি লেখক কে? প্রিয় গল্পকার যদি বলতে বলা হয়, তাহলে অনেকেই আছে। কারণ একজনের সব লেখা প্রিয় হয় না। রবীন্দ্রনাথেরও সব লেখা আমার প্রিয় না। তবে কমলকুমার মুজমদার, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর, মানিক, হুমায়ূনের অনেক ছোটগল্প আমার বেশ প্রিয়। তাদের অনেক উপন্যাসও তৃপ্তি নিয়ে পড়ি। আমার সমসাময়িক, অগ্রজ, অনুজ, নতুন, পুরাতন সব লেখকদের আমি আগ্রহী পাঠক। শাহাদুজ্জামান, স্বকৃত নোমান, জাকির তালুকদার, আহমাদ মোস্তফা কামালদেরও ভালো লাগে। আর একান্ত প্রিয় ও আগ্রহের পাঠ বললে, কাফকা এবং চেকভ।
0 Comments