সাকি সোহাগ
‘আর রাখঢাক না রেখে ওকে বলছিলাম- নীরা আপনাকে আমার পছন্দ হয়েছে। আপনি দেখতে অনেকটা স্বাভাবিক সুন্দরী। আপনার চোখ, টিকালো নাক, ঠোঁট কোন বাড়তি কারুকাজ নেই, অথচ সব কেমন সুন্দর! কিন্তু সব ছাপিয়ে আরও সুন্দর আপনার দুটি স্ফিত স্তন।’‘চাতক প্রায় অহর্নিশি' আধ্যাত্নিক এক গল্পের মানুষ সুমন মজুমদারের এ বছর (২০২৪) প্রকাশিত নতুন গল্পের বই। ১১টি বইয়ের নাম থেকে যে বইটা আমি পছন্দ করে ছিলাম সেটা সুমন মজুমদারের এই বইটা। পছন্দ করার মূল কারণ ছিল বইটার নাম। কারণ, তখনো বইটার প্রচ্ছদ দেখিনি বা বইটার সম্পর্কে কিছু জানতাম না। শুধু নামটা ভালো লেগেছিল বলে বইটা এখন আমার হাতে। বইটা প্রথম হাতে নেওয়ার পর ভালো লেগেছিল। অন্যরকম একটা ভালো লাগার অনুভূতি কাজ করছিল। ঠিক সেরকম অনুভূতি বইটা পড়ার পরে আর ফিরে পাইনি।
‘টানা বারান্দার শেষ মাথায় দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে একটা মিশমিশে আবলুস কাঠের বুক সেলফ, ওর তাকে সাড়ি করে সাঁজানো পাতলা খয়রি চামড়ার মোড়া বই। সেখান থেকে ধুলা পড়া একটা বই খুলে বসলাম পাশের ইজিচেয়ারে। ধুলো ঝেড়ে বইয়ের প্রচ্ছদ উল্টাতেই আমার সঙ্গে দেখা নীরার।’
তারপর নীরার সাথে চলতে থাকে লেখক। এ কথায় সে কথায় নীরার হাসি ফুটে উঠে মুখে। কখনো অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, কখনো মুগ্ধ হয়ে লেখকের কবিতা শোনে। কল্পনায় হাঁটতে হাঁটতে উচু পাহাড় পর্যন্ত চলে যায় তারা। শুধু ‘বিবলিয়ো’ গল্পে না। বইটার প্রায় গল্প লেখক সাজিয়েছেন দ্বিতীয় চিন্তার অধীনে। মানুষের অবচেতন মস্তিষ্কের দারুণ এক খেল দেখিয়েছেন গল্পগুলোয়। প্রতিটা গল্পে কাল্পনিক চিন্তাগুলোকে বেশ দক্ষতার সাথে গেঁথে দিয়েছেন! ফলে পড়ার সময় পাঠক একটা ঘোরের মধ্যে থাকতে পারে। পাঠককে ভাবিয়ে তুলতে পেরেছে সুমন মজুমদার।
‘রাস্তায় হাঁটার সময় কেউ ইচ্ছে করে তোমাকে ধাক্কা মেরে নর্দমায় ফেলে দিলেও তাকে তুমি কিছু করতে পারবে না। বাসে কন্ডাকটর দশ টাকার ভাড়া পনের টাকা নিয়ে আবার দু’টো বাড়তি কথা শুনিয়ে দিলেও, তুমি মনে মনে বলবে, থাক গরিব মানুষ। অফিসের কলিগ তোমার বউকে নিয়ে অশ্লীল ইঙ্গিত করলে ভাববে এদের আর শিক্ষা হলো না!’
‘নপুংসক’ গল্পে নিজের ভিতরটার সাথে নিজেই কথা বলেছেন লেখক। আলমারির উপর পা ঝুলিয়ে বসে থাকা ভূতটা মূলত লেখকের নিজেরই প্রতিচ্ছবি। চেহারাও লেখকের মতোয়। উপরের কথাগুলো সেই ভূত বলছিল লেখককে। সেই ভূতটা লেখকের দুর্বলতা নিয়ে কথা বলছিল। যেটা প্রতিতা মানুষের মধ্যেই হয়। প্রতিটা মানুষ কখনো কখনো হ্যা-না দ্বন্দ্বে পড়ে যায়। ভিতর থেকে কেউ হ্যা করে আবার কেউ না করে। সেই কেউ হচ্ছে ওই গল্পের ভূতটা। এই গল্পটা বইয়ের শেষের দিকে। আরাম করে পড়তে পেরেছি। এই বইটিতে মোট ৮টি গল্প রয়েছে। শেষের তিনটা গল্প যথারীতি বিবলিয়ো, সুড়ঙ্গ, নপুংসক পড়ে মজা পেয়েছি। পড়ার যে আনন্দ সেটা শেষ তিনটা গল্পে এসে পেয়েছি। আগের গল্পগুলো পড়তে বেশ অস্বস্তি বোধ করছিলাম।
‘রাতের রাস্তায় নিয়ন আর চন্দ্র আলোর সংকর বন্যা ডিঙিয়ে অস্তিত্ব ঘোষণা করতে করতে আরেকটা গাড়ি চলে গেলো। এ কী, ওই দূরে কাকে যেন দেখা যায়। ওর শরীর বোঝা যায় না, কেবল একটা ছায়া রাস্তার মধ্যে যেন একটু একটু করে এগিয়ে আসছে। কে ও, কি চায়, কোথা থেকে আসছে?’
সম্প্রতি ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিল হতে গল্প-উপন্যাস বিভাগে লেখক সম্মাননা-২০২৩ প্রাপ্ত আধ্যাত্মিক কথাসাহিত্যিক সুমন মজুমদার তার লেখার মাঝে ভাবনার খোড়াক রেখেছেন। পাঠক তার লেখা পড়ার সময় ভাববে। গভীর মনযোগ দিয়ে কিছু খোঁজার চেষ্টা করবে। কিছু দেখার চেষ্টা করবে। লেখক তার কল্পনা শক্তির ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন প্রতিটা গল্পে। তবে গল্পের ভিতরের গল্পটা খুব ছোট। পড়তে গিয়ে বেশ বিরক্ত হয়েছি। মনে রাখার মতো কোন স্মৃতি গল্পে রাখেননি। লেখক প্রতিটা লেখায় বেশ ভাবনায় রেখেছেন পাঠককে। তবে যে গল্পটার মধ্যদিয়ে পাঠককে ভাবাবে সেই গল্পটা বেশ এলোমেলো ও অল্প ছিল। গল্পের থেকে লেখা বেশি মনে হয়েছে। লেখার তুলনায় সেই লেখার ভিতরের গল্পটা খুব বেশি দূর এগিয়ে নিতে পারেনি সুমন মজুমদার। অনেকটা বলতে গেলে- আমি বাসা থেকে নিচে নামলাম, রিক্সায় করে অফিসে গেলাম। অফিস থেকে বাজারে এসে বাজার করলাম। বাজার নিয়ে বাসার ফিরলাম। এইটুকু গল্পের মধ্যে লেখক অনেক লেখা ঢুকিয়েছে। যেমন ‘রিক্সায় উঠার সময় হালকা হাওয়া গায়ে লাগছিল। হাওয়াটা শরীর শীতল করে দিলো। আমি চোখ বন্ধ করলাম। শরীরে আরাম এলো।’ গল্পে উপকথা বা উপমা অনেক বেশি ছিল। ফলে সেগুলোর প্রভাবে এত বেশি দূর নিয়ে যাবে পাঠককে, পাঠক গল্পটাই মনে রাখতে পারবে না।
কিন্তু একটা বিষয় ভালো লেগেছে, লেখক নিজের লেখায় নিজস্বতা ধরে রেখেছেন। ‘ছায়াচর্যা’ গল্পের একটা লাইনে এসে লেখক বলেছেন- ‘চৌরাস্তার ধারের ফুটপাতে এই অসময়েও দোকান খুলে বসে আছে এক চা খাওয়ানেওয়ালা। তবে খানেওয়ালা না থাকায় সে অবশ্য খানিকটা বিরক্ত।’ এখানে আমি আপনি হলে হয়তো চা বিক্রিতা বা চায়ের ক্রেতা বলতাম। তিনি পুরো বইটিতে এমন অনেক সুন্দর শব্দ ব্যবহার করেছে। বইটার লেখা, লেখার পরিবেশ, চরিত্র, শব্দের গঠন সব অসাধারণ। বইটা পড়ার পর আমার কাছে প্রথম যেটা মনে হয়েছে সেটা হলো এই বইটা কবিতার ভাষায় লেখা। কবিতার যে একটা টান আছে, ভাব আছে। সেই টান, ভাব এই বইয়ের গল্পগুলো পড়লে চোখে বাঁধবে। এটা পাঠক হিসেবে একেকজন একেকভাবে নিবে। কবিতায় আমরা যাকে বাচাল বলি, গল্পে তাকে বলি- ধুরো মিয়া আপনি বেশি কথা কন কিল্লাই? সুমন মজুমদার গল্পেও তাকে বাচালই বলেছেন। গল্পের শাখা-প্রশাখা কম ছিল। যদিও ছোট গল্প এমনই হয়। তবুও পাঠের তৃপ্তির দিকেও খেয়াল রাখা উচিৎ। লেখক গল্পগুলোকে ভাবিয়ে তুলেছেন। কিন্তু পাশাপাশি খুব বেশি জমিয়ে তুলতে পারেননি। এখানে এসে আমার কাছে মনে হয়েছে একজন সুমন মজুমদার গল্পের থেকে কবিতায় অনেক ভালো করবে।
‘কয়েকটি বুটজুতোর শব্দ নারী কণ্ঠটির দিকে এগিয়ে যায়। ওকে কী অন্য কোথাও নিয়ে যাচ্ছে! কোথায়? নারী কণ্ঠটি কথা বলে ওঠে- প্রফেসর, আর হয়তো দেখা হবে না। তবু বলি, জীবনের সব ক্ষেত্রে যুক্তি কাজ করে না। কখনো কখনো অন্ধ আবেগ আর প্রতিশোধ স্পৃহাও তাকে চালিত করে। রাশি রাশি সোনার ফসল কল্পনাতেই সুন্দর। তাকে গোলায় ভরতে মাঠে হাড় নিংড়ানো ঘাম ঝরাতে হয়। বিদায়...’
এই গল্পটা বইটার মধ্যে সেরা গল্প। এই গল্পে আটকে ছিলাম। গল্পটার ভিতরে প্রবেশ করেছিলাম। মনে হচ্ছিল আমিই জঙ্ঘলের মধ্যদিয়ে যাচ্ছি। পায়ে কাটা বিঁধে গেছে। রক্তাক্ত পা নিয়ে সামনে এগোচ্ছি। কারণ, কমান্ডার বলতেন- ‘পৃথিবীতে মানুষ আছে বহু। এর মধে একদল জন্ম নিয়েছে কেবল সয়ে যেতে আর অন্যদল জন্ম নিয়েছে ভার চাপিয়ে দিতে। সয়ে যাওয়া সেসব মানুষ তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ভার বইতে বইতে একসময় ভারবাহী গাধায় পরিণত হয়। ভার চাপিয়ে মানুষেরা তাদের চাবকে পিঠের ছাল তুলে নিলেও সে বোবা পশু রা করে না। এর মধ্যে কেউ কেউ আবার গা ঝাড়া দিয়ে মেরুদণ্ড সোজা করে মানুষ উঠে দাঁড়ায়। ভারবাহী সে বোবা পশুগুলোকে ফের মানুষ হতে সাহায্য করা তো তাদেরই দায়িত্ব। আমরা তাই করছি।’
প্রফেসরের কষ্ট দেখে বারবার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মনে পড়ছিল। এই গল্পতে লেখক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে গেছেন। দেশের কিছুটা প্রেক্ষাপট এখানে এসে ভেসে উঠেছে। পাঠক এই গল্পটা আর সুড়ঙ্গ গল্পটা পড়ে বেশ আনন্দ পাবে। এখানে লেখার ভিতর দারুণ একটা গল্পকে টানিয়ে নিয়ে গেছেন সুমন মজুমদার।
১৯৮২ সালে ভোলায় জন্মগ্রহণ করা ‘চাতক প্রায় অহনির্শি’র স্রষ্টা সুমন মজুমদার বেড়ে উঠেছেন ঢাকাতে। খুব সম্ভবত ‘চাতক প্রায় অহনির্শি’ তার দ্বিতীয় গ্রন্থ। সাড়ে পাঁচ ফর্মার এই বইটিতে মোট আটটি গল্প জায়গা পেয়েছে। পুরো বইটিতে শব্দের গঠন ভালো ছিল। বেশ কিছু বানান ভুল থেকে গেছে। তবে তুলনামূলকভাবে অনেকটা কম। বইটার মনকাড়া প্রচ্ছদ এঁকেছেন ধ্রুব এষ। দুইশ চল্লিশ টাকার প্রচ্ছদ মূল্যের এই বইটা প্রকাশ করেছে বিদ্যাপ্রকাশ প্রকাশনী। বইটার বাইন্ডিং সর্বোচ্চ মানসম্মত। হার্ড কাভার ও ভিতরের পাতাগুলো বেশ সুন্দর ও দামি। বইটা সংগ্রহে রাখার মতো।
গ্রন্থ- চাতক প্রায় অহনির্শি
লেখক- সুমন মজুমদার
প্রকাশনী- বিদ্যাপ্রাকাশ
প্রচ্ছদ- ধ্রুব এষ
মূল্য- ২৪০ টাকা মাত্র
লেখক : গল্পকার ও সমালোচক
0 Comments